এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা ২০২৬: ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ও বিডিএস ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কঠোর অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের সব অনলাইন ও অফলাইন মেডিকেল কোচিং সেন্টার সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে ভর্তি সংক্রান্ত কমিটি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো ধরনের কোচিং কার্যক্রম চালু রাখা যাবে না।
এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা ২০২৬
গতকাল সোমবার (৮ ডিসেম্বর ২০২৫) স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক রুবীনা ইয়াসমীন সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আগামী ১২ ডিসেম্বর সারা দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে এই ভর্তি পরীক্ষা। তবে এবারের পরীক্ষার আগে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মেডিকেল কলেজগুলোর আসনসংখ্যায় বড় ধরনের পরিবর্তন। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন কমানো হয়েছে, যা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট বৃত্তি ২০২৫: অনার্স ও ডিগ্রির শিক্ষার্থীদের আর্থিক অনুদান
আমাদের শিক্ষা ডেস্ক থেকে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা কোচিং বন্ধের প্রেক্ষাপট, আসন কমানোর পরিসংখ্যান, এর নেপথ্যের কারণ এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য শেষ মুহূর্তের নির্দেশনা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব।
একনজরে: এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা ও আসন বিন্যাস
পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সুবিধার্থে এবারের ভর্তি পরীক্ষার মূল তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
| তথ্যের ধরণ | বিবরণ |
| পরীক্ষার তারিখ | ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ |
| কোচিং বন্ধের মেয়াদ | ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত |
| মোট আসন হ্রাস | ৫৭২টি (সরকারি ২৮০ + বেসরকারি ২৯২) |
| বর্তমান সরকারি আসন | ৫,১০০টি |
| বর্তমান বেসরকারি আসন | ৬,০০১টি |
| নিয়ন্ত্রক সংস্থা | স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর (DGME) |
কোচিং সেন্টার বন্ধ: স্বচ্ছতার স্বার্থে কঠোর পদক্ষেপ
ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রশ্নপত্র ফাঁস বা জালিয়াতির গুজব ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর এবারও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
অধ্যাপক রুবীনা ইয়াসমীন জানান, ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব ধরনের মেডিকেল কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে। এই নির্দেশনার আওতায় শুধুমাত্র ফিজিক্যাল কোচিং নয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত কোচিং কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কড়া নজরদারি রাখবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এই আদেশ অমান্য করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: সামরিক ভূমি ও ক্যান্টনমেন্ট অধিদপ্তর নিয়োগ: ৪৫ পদে সরকারি চাকরির সুযোগ, আবেদন অনলাইনে
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে কোচিং বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে স্থির রাখতে সহায়তা করে। এতে শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো গুজবে কান না দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের রিভিশনে মন দিতে পারে।
মেডিকেলে আসনসংখ্যায় বড় পরিবর্তন: পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ
এবারের ভর্তি প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলো আসনসংখ্যা হ্রাস। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের নতুন সমন্বয়ের ফলে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই আসন কমেছে।
১. সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন পরিস্থিতি
আগে দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে মোট আসন ছিল ৫ হাজার ৩৮০টি। কিন্তু শিক্ষার মান এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা যাচাইয়ের পর নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
- কমেছে: ১৪টি সরকারি মেডিকেলে মোট ৩৫৫টি আসন কমানো হয়েছে।
- বেড়েছে: ৩টি মেডিকেলে ৭৫টি আসন বাড়ানো হয়েছে।
- নিট ফলাফল: সব মিলিয়ে সরকারি খাতে ২৮০টি আসন কমে বর্তমানে মোট আসন দাঁড়িয়েছে ৫,১০০টি।
এটি সরকারি মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন দেখা মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি দুঃসংবাদ। কারণ, সরকারি মেডিকেলের প্রতিটি আসনই অত্যন্ত মূল্যবান।
২. বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন পরিস্থিতি
বেসরকারি খাতের চিত্রও ভিন্ন নয়। মানহীন শিক্ষা এবং পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবের কারণে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ওপরও খড়গ নেমে এসেছে।
- কমেছে: ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেলে আরও ২৯২টি আসন কমানো হয়েছে।
- বর্তমান আসন: আসন কমানোর ফলে বেসরকারি মেডিকেলে এখন মোট আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬,০০১টি।
সব মিলিয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট ৫৭২টি আসন কমেছে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় সমসংখ্যক বা বেশি শিক্ষার্থী আবেদন করলেও আসন কমে যাওয়ায় প্রতিযোগিতা হবে তীব্রতর।
কেন কমল আসন? নেপথ্যের কারণ
হঠাৎ করে এত বিপুল সংখ্যক আসন কমানোর পেছনে যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। মূলত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।
ক. শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মেডিকেল শিক্ষায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর একটি নির্দিষ্ট অনুপাত থাকা জরুরি। অনেক কলেজে পর্যাপ্ত অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক নেই, অথচ সেখানে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছিল। এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতেই আসন কমানো হয়েছে।
খ. অবকাঠামোগত ঘাটতি
অনেক নতুন ও পুরাতন মেডিকেল কলেজে ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি এবং হাসপাতাল শয্যার সংকট রয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে আসন সংখ্যা অবকাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে।
গ. বিএমডিসির অ্যাক্রেডিটেশন
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BM&DC)-এর অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি বজায় রাখতে কলেজগুলোকে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। যারা এই মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের আসন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষার মানবণ্টন ও পাস নম্বর
১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষার মানবণ্টন এবং পাস নম্বর সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি।
-
মোট নম্বর: ১০০ (এমসিকিউ)।
-
সময়: ১ ঘণ্টা।
-
বিষয়ভিত্তিক নম্বর:
-
জীববিজ্ঞান: ৩০
-
রসায়ন: ২৫
-
পদার্থবিজ্ঞান: ২০
-
ইংরেজি: ১৫
-
সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ + আন্তর্জাতিক): ১০
-
- নেগেটিভ মার্কিং: প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটা যাবে।
- পাস নম্বর: ৪০। লিখিত পরীক্ষায় ৪০-এর কম নম্বর পেলে প্রার্থী অকৃতকার্য বলে গণ্য হবেন।
এছাড়া এসএসসি ও এইচএসসি জিপিএ-র ওপর ভিত্তি করে ২০০ নম্বর (এসএসসি x ১৫ + এইচএসসি x ২৫) যুক্ত হয়ে মেধা তালিকা তৈরি হবে। সেকেন্ড টাইমারদের জন্য মোট প্রাপ্ত নম্বর থেকে ৫ নম্বর এবং সরকারি মেডিকেলে ভর্তি থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে।
পরীক্ষার্থীদের জন্য শেষ মুহূর্তের জরুরি নির্দেশনা
পরীক্ষা ঘনিয়ে আসায় পরীক্ষার্থীদের এখন নতুন কিছু পড়ার চেয়ে রিভিশন এবং মানসিক প্রস্তুতির দিকে নজর দেওয়া উচিত।
১. প্রবেশপত্র ও কাগজপত্র: পরীক্ষার হলে প্রবেশের জন্য অ্যাডমিট কার্ডের রঙিন কপি এবং এইচএসসি রেজিস্ট্রেশন কার্ডের মূল কপি সাথে রাখতে হবে। ২. নিষিদ্ধ বস্তু: মোবাইল ফোন, ক্যালকুলেটর, স্মার্টওয়াচ বা যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি কান ঢাকা থাকে এমন পোশাক বা অলঙ্কার পরা থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ৩. সময়ানুবর্তিতা: পরীক্ষার দিন সকাল ৯:৩০ মিনিটের মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। ১০টার পর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ঢাকার যানজট বিবেচনা করে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বের হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ৪. গুজব থেকে দূরে থাকা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজবে কান দেবেন না। নিজের প্রস্তুতির ওপর আস্থা রাখুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: আসন কমে যাওয়ায় কি কাট মার্ক (Cut Mark) বাড়বে? উত্তর: আসন কমে যাওয়ায় প্রতিযোগিতা বাড়বে, ফলে কাট মার্ক গতবারের চেয়ে কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি প্রশ্নের কাঠিন্যের ওপরও নির্ভর করবে।
প্রশ্ন ২: কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকলে মডেল টেস্ট দেব কীভাবে? উত্তর: সরকারি নির্দেশনায় সব ধরনের কোচিং বন্ধ। তবে শিক্ষার্থীরা বাসায় বসে ঘড়ি ধরে বিগত বছরের প্রশ্ন বা মডেল টেস্ট বই থেকে পরীক্ষা দিতে পারেন।
প্রশ্ন ৩: সিট প্ল্যান কবে জানা যাবে? উত্তর: সাধারণত পরীক্ষার ২-৩ দিন আগে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট এবং টেলিটকের মাধ্যমে সিট প্ল্যান জানিয়ে দেওয়া হয়। মোবাইলে এসএমএস-ও আসবে।
এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা ২০২৬ শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে আসন সংখ্যা হ্রাস, অন্যদিকে কোচিং বন্ধের কড়াকড়ি—সব মিলিয়ে এবারের ভর্তিযুদ্ধ হবে মেধা ও মানসিক শক্তির পরীক্ষা। তবে মানসম্মত ডাক্তার তৈরির লক্ষ্যে সরকারের এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যখাতের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়।
আরও পড়ুন: বিপিএল টিকিটের দাম ২০২৬: অনলাইন ও ব্যাংকে টিকেট কেনার নিয়ম (পূর্ণাঙ্গ গাইড)
শিক্ষার্থীদের উচিত হতাশ না হয়ে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করা। ভর্তি সংক্রান্ত যেকোনো ব্রেকিং নিউজ, সিট প্ল্যান এবং ফলাফলের আপডেট সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
আরও পড়ুন: দাখিল রেজিস্ট্রেশন নবায়ন ২০২৬: অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শেষ সুযোগ ও নিয়মাবলী (গাইড)


