আলো ঘর শিক্ষা ডেস্ক: দীর্ঘ ৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পর্যালোচনার কাজে গতি এসেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জাতীয় বেতন কমিশন ও নতুন পে স্কেল নিয়ে সাধারণ চাকরিজীবীদের আগ্রহের শেষ নেই। সেই আগ্রহে নতুন মাত্রা যোগ করে আগামী সোমবার (২৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়-এর অধীনস্থ জাতীয় বেতন কমিশন (National Pay Commission)-এর এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিশনের সভাপতি জাকির আহমেদ খান। বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা উপস্থিত থাকবেন। মূল এজেন্ডা হলো—বিদ্যমান বেতন কাঠামো পর্যালোচনা এবং নতুন সুপারিশ প্রণয়নের কাজকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া। আলো ঘর-এর পাঠকদের জন্য এই প্রতিবেদনে আমরা কমিশনের বর্তমান পদক্ষেপ, অর্থ উপদেষ্টার বার্তা এবং ভবিষ্যৎ বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
সচিবদের সঙ্গে বৈঠকের মূল এজেন্ডা ও আলোচনার বিষয়
আগামী ২৪ নভেম্বরের বৈঠকটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পে কমিশনের পক্ষ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই বৈঠকে মূলত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনা হবে। কমিশনের লক্ষ্য হলো প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জগুলো সরাসরি সচিবদের কাছ থেকে শোনা।
- পর্যালোচনার ক্ষেত্র: সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, সরকারি অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান সুযোগ-সুবিধা বিশ্লেষণ করা হবে।
- মতামত যাচাই: এর আগে ১ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে সাধারণ নাগরিক ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে যে মতামত সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা নিয়ে সচিবদের সাথে আলোচনা করা হবে।
- বাস্তবতা বিশ্লেষণ: বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
জাতীয় বেতন কমিশন ও নতুন পে স্কেল নিয়ে অর্থ উপদেষ্টার বার্তা
সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, গত আট বছরে এই খাতে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা সরকারি কর্মচারীদের জীবনমানে প্রভাব ফেলেছে। তাই এবার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “তিনটি রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সেগুলো যাচাই-বাছাই করেই চূড়ান্ত সুপারিশ নির্ধারণ করা হবে। বর্তমান সরকার কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করবে, আর পরবর্তী সরকার সেটি বাস্তবায়ন করবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাজেটসংশ্লিষ্ট বাস্তবতা এবং সামাজিক খাতে ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে। অর্থাৎ, বেতন বৃদ্ধি হবে, তবে তা বাংলাদেশ ব্যাংক-এর অর্থনৈতিক সূচক ও সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
আরও পড়ুন: ব্যাংকের ছুটির তালিকা ২০২৬ প্রকাশ: চাকরিজীবীরা ছুটি পাবেন ২৮ দিন
পে কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম ও সময়সীমা
গত ২৭ জুলাই গঠিত হয় এই জাতীয় বেতন কমিশন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া। কমিশনের কাজের গতি এবং পরিধি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা বেশ কিছু ধাপে কাজ করছে:
- তথ্য ও মতামত সংগ্রহ: অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধে ডিজিটাল প্রশ্নমালার মাধ্যমে অংশীজনদের (Stakeholders) মতামত নেওয়া হয়েছে।
- বিভাগীয় বৈঠক: ২৪ নভেম্বর সচিবদের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে প্রশাসনিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হবে।
- ড্রাফট ও সুপারিশ: নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে খসড়া তৈরি করা হবে।
- চূড়ান্ত প্রতিবেদন: ডিসেম্বরের শেষ দিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-এর মাধ্যমে সরকারের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হতে পারে।
যারা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় মোটিভেশন। নতুন বেতন কাঠামোতে চাকুরির আকর্ষণ আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়। এ সংক্রান্ত চাকরির বিজ্ঞপ্তি নিয়মিত আমাদের সাইটে আপডেট করা হয়।
কেন নতুন পে স্কেল জরুরি ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০১৫ সালে সর্বশেষ ৮ম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ এক দশকে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে জাতীয় বেতন কমিশন ও নতুন পে স্কেল অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
- মুদ্রাস্ফীতি: গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বহুগুণ বেড়েছে। ফলে ফিক্সড ইনকাম গ্রুপ বা সরকারি চাকরিজীবীরা হিমশিম খাচ্ছেন।
- জীবনযাত্রার ব্যয়: বাসা ভাড়া, চিকিৎসা এবং শিক্ষার খরচ বেড়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন না হলে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখা কঠিন হবে।
- বৈষম্য দূরীকরণ: বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বেতনের ব্যবধান কমানো এবং বৈষম্য দূর করা কমিশনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
নতুন বেতন কাঠামোতে সম্ভাব্য পরিবর্তন ও সুযোগ-সুবিধা
যদিও কমিশন এখনো চূড়ান্ত কোনো রূপরেখা দেয়নি, তবে বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা অনুযায়ী জাতীয় বেতন কমিশন ও নতুন পে স্কেল-এ নিচের বিষয়গুলো থাকতে পারে:
- বেসিক স্যালারি বৃদ্ধি: মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
- ভাতা সমন্বয়: বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা এবং যাতায়াত ভাতা বর্তমান বাজারদরের সাথে সমন্বয় করা হতে পারে।
- নতুন সুবিধা: স্বাস্থ্যবীমা বা বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা সম্পন্ন কর্মীদের জন্য আলাদা ইনসেনটিভ থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আরও জানতে আমাদের Tech News বিভাগটি দেখতে পারেন।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা
২৪ নভেম্বরের বৈঠকের পর কমিশনের কার্যক্রম আরও দৃশ্যমান হবে। যেহেতু বর্তমান সরকার কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করছে, তাই পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেবে বলে অর্থ উপদেষ্টা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে সাধারণ চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত যেন এই সুপারিশগুলো আলোর মুখ দেখে। ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা হলে, ২০২৬ সালের শুরুতেই হয়তো নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসতে পারে। এ সংক্রান্ত সব আপডেট সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
আকাশ মাহমুদ, শিক্ষা বিভাগীয় প্রধান: [আলো ঘর]-এর শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি গত ৫ বছর ধরে শিক্ষা বোর্ড, ভর্তি পরীক্ষা এবং শিক্ষানীতি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ পরিবেশন করে আসছেন।
আরও পড়ুন: সরকারি চাকরিজীবীদের ছুটির প্রকারভেদ: পূর্ণাঙ্গ নিয়মাবলী ও মঞ্জুরির গাইড


